সেলিম জাহিদ
নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন 'হিযবুত তাহরীর বাংলাদেশ' 'খিলাফত রাষ্ট্র' প্রতিষ্ঠার স্লোগানে নিজস্ব ধ্যান-ধারণার বই-পুস্তক, পোস্টার, লিফলেট প্রকাশ করে খোদ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যথারীতি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট সংগঠনটি ৪৪ পৃষ্ঠার একটি খসড়া দলীয় সংবিধান প্রকাশ করে তা বিভিন্ন গণমাধ্যম কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। গত বুধবার এ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও তাদের নামে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।
তাদের কথিত সংবিধানে বলা হয়, রাষ্ট্রের প্রধান হবে 'খলিফা', রাষ্ট্রের কাঠামো থাকবে ১৪টি। কথিত এ সংবিধানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বেশ কিছু বিতর্কিত বিষয় সনি্নবেশিত করা হয়। সংগঠনটির স্বপ্নের রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা হবে এককেন্দ্রিক। রাষ্ট্রের চারটি সর্বোচ্চ শাসক পদ যথাক্রমে খলিফা, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী, গভর্নর ও মেয়র পদে অমুসলিম ও নারীদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি, 'মাজালিম আদালতের' বিচারক, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও 'আমির-উল-জিহাদ' (জিহাদের অধিনায়ক) পদেও নারীদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। কথিত সংবিধানে (ধারা-১৯) বলা হয়, 'শাসক কিংবা শাসকের পদে আসীন যেকোনো ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলিম, পুরুষ, স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী, দায়িত্ব পালনে যোগ্য ও সক্ষম এবং ন্যায়পরায়ণ হতে হবে।'
ধারা-৫১, আমির উল জিহাদে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্রে আমির উল জিহাদ নামে একটি বিভাগ থাকবে। পররাষ্ট্র বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শিল্প বিভাগের সমন্বয়ে এর কার্যালয় গঠিত হবে। চারটি বিভাগ আমির উল জিহাদ নিয়ন্ত্রণ করবে। ভারী শিল্পসহ দেশের সব শিল্পকারখানা সামরিক নীতিমালার ভিত্তিতেই স্থাপিত হবে।'
জিহাদকে ফরজ করে হিযবুত তাহ্রীর দেশের সব মুসলিম নাগরিকের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে। বলা হয়, 'জিহাদ সব মুসলিমের জন্য ফরজ। সুতরাং সব মুসলিম নাগরিকের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। ১৫ বছর বয়স্ক বা তদূর্ধ্ব প্রতিটি মুসলিম পুরুষের জন্য জিহাদের প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে (ধারা-৫৬)।'
মুসলমানদের রাজনৈতিক দল করার অধিকার দেওয়া হলেও কথিত সংবিধানে অমুসলিমদের বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। আবার মুসলিমদের রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে ধর্মের বাইরে গেলে নিষিদ্ধ হওয়ার খৰ আরোপ করা হয়েছে।
হিযবুত তাহরীরের কল্পিত রাষ্ট্রে 'কাজী আল খুসুমাত', 'কাজী আল হিসবা' ও 'কাজী আল মুহকামাত আল মাজালিম' নামে তিন ধরনের বিচারক থাকবেন। তাঁরা যথাক্রমে জনগণের মধ্যে লেনদেন ও শাস্তি-সংক্রান্ত বিষয়, জনগণের অধিকার-সংক্রান্ত আইন ভঙ্গের বিচার এবং জনগণ ও শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করবেন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন খলিফা।
নারীদের বিষয়ে সংগঠনটি বলেছে, 'একজন নারী প্রধানত মা ও গৃহবধূ। তিনি একজন মর্যাদার পাত্র এবং তাঁকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখা বাধ্যতামূলক।... একজন নারীর জন্য শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করার অনুমতি নেই। সুতরাং একজন নারী খলিফা, মত্তুয়াউয়িন, ওয়ালি কিংবা আমির পদ গ্রহণ করতে পারবেন না।'
হিযবুত তাহরীর বলেছে, তাদের রাষ্ট্রের মুদ্রা হবে স্বর্ণ বা রৌপ্যের। এ ছাড়া অন্য কোনো ধরনের ধাতবমুদ্রা ব্যবহার অনুমোদিত হবে না। তবে রাষ্ট্র প্রয়োজনবোধে স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রার পরিবর্তে অন্য কোনো ধরনের মুদ্রা প্রস্তুত করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে সমপরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকতে হবে।
সংগঠনটি দেশে বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করবে এবং বিদেশিদের বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধার অধিকারও নিষিদ্ধ করবে। এমনকি রাষ্ট্র ছাড়া বাইরের দেশের সঙ্গে কোনো ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠী বা সংগঠনের সম্পর্ক থাকাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখবে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও আরব লিগের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্নের কথা বলা হয়েছে তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে। বলা হয়েছে, 'ইসলামী ভিত্তির ওপর গঠিত নয় কিংবা অনৈসলামিক বিধিবিধান সংবলিত কোনো সংগঠনে যোগ দেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।' কথিত সংবিধানে আরো বলা হয়, 'খিলাফত রাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ হবে দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে এ বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে ইসলামের সুমহান বাণীকে পেঁৗছে দেওয়া। এটিই খিলাফত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।'
হিযবুত তাহরীর বলেছে, তাদের শিক্ষা নীতি, পাঠ্যসূচি এবং শিক্ষার পদ্ধতি হবে একান্তই ইসলামী আকিদাভিত্তিক। রাষ্ট্র প্রণীত শিক্ষা পাঠ্যক্রম ছাড়া অন্য কোনো পাঠ্যক্রম অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হবে। খসড়া সংবিধানের হিযবুত তাহরীর খিলাফত রাষ্ট্র সব নাগরিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার এবং সবার জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করে।
হিযবুত তাহরীরের তৎপরতা সম্পর্কে গতকাল শনিবার রাতে যোগাযোগ করা হলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ বলেন, 'এ বিষয়ে কথা বলার সময় এখন নয়।' তিনি এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি।
২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর সরকার সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ ও যুগ্ম সমন্বয়কারী কাজী মোরশেদুল হক, সিনিয়র উপদেষ্টা অধ্যাপক সৈয়দ গোলাম মাওলাসহ পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মীকে ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
No comments:
Post a Comment
মন্তব্য করুন