10 February 2010

বিশেষ পরিকল্পনায় ছাত্রশিবির মাঠে

পারভেজ খান

রাজধানীসহ সারা দেশে বেড়ে গেছে হত্যাকাণ্ড। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতি আছে, দেশের এ ধরনের প্রায় সব কটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বিরাজ করছে উত্তপ্ত আর থমথমে পরিস্থিতি। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ ধরনের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে।

পুলিশসহ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, আরো বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। এ রকম আভাস তারা পেয়েছে। তাদের মতে, একটি বিশেষ মহল শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলে রাজনৈতিক ফায়দা লুটবার জন্য আলটিমেটাম নিয়ে মাঠে নেমেছে। এ ছাড়া পুলিশ সদস্যদেরও কেউ কেউ এই পরিস্থিতি সৃষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। এ ব্যাপারেও সতর্কতার সঙ্গে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা দপ্তরের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্বে আছেন তাঁদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঘটে থাকে। ফলে এ বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় হাত দিয়েছে। এই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা চিহ্নিত তারা প্রত্যেকেই একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর সেই রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনই ছাত্রশিবির। আর এই ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র ক্যাডারদেরই এই পরিকল্পনা বা আলটিমেটাম দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে।

ছাত্রশিবিরের এক হাজারের বেশি জুনিয়র সক্রিয় সদস্য নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে বর্তমানে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সঙ্গে মিশে আছে। এসব সদস্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তি এবং ভর্তির পর হল-ছাত্রাবাসে সিট পাওয়ার জন্য ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের কর্মী বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু দলে টানার আগে এই দুই সংগঠনের কোনোটাই ওই সব ছাত্রদের অতীত সম্পর্কে খোঁজখবর নেয় না। এখন সেই সব ছাত্রকে দিয়েই পরিস্থিতি ঘোলা করা শুরু হয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখন ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ আর দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বসে এই মুখোশধারী ছাত্রদের অতীত পরিচয় খুঁজে বের করছেন। ইতিমধ্যে তাঁদের হাতে বেশ কিছু প্রমাণও এসে গেছে বলে এক কর্মকর্তা জানান।

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, গত ৩৭ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ৭৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর বাইরেও ঘটেছে চাঞ্চল্যকর ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও খুন হয়েছেন। কিন্তু একমাত্র ১৯৭৪ সালের সাত খুনের ঘটনা ছাড়া কোনোটারই বিচার হয়নি। এসব মামলার পুরনো নথিগুলোও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ফারুক হত্যাকাণ্ডের দিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন রাজশাহীর পুলিশের উপকমিশনার নুরুল আমিন। তাঁর বিরুদ্ধেও একটি মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ আছে। ওই দিন নুরুল আমিনের সঙ্গে আরো পাঁচজন সহকারী পুলিশ কমিশনারও দায়িত্বরত ছিলেন। তাঁরা হচ্ছেন এসি জাহাঙ্গীর, এসি তারেক, এসি মাহফুজ, এসি হুমায়ুন কবির এবং এসি মৃণাল কান্তি। এঁদের মধ্যে প্রথম চারজন গত সরকারের শাসনামলে চাকরিতে ঢুকেছিলেন। ছাত্রজীবনে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান কী এবং কেমন ছিল, সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

গত ১৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ৯ মার্চ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে শিবির যে তাণ্ডব চালায়, সে সময়ও এই পুলিশ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন একটি রাজনৈতিক দল থেকে এই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে তাঁদের প্রত্যাহারের দাবি তোলা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গতকাল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ঘটনার সময় রাজশাহীর পুলিশ কমিশনারকেও ফোন করে ঘুমে পাওয়া যায়। এ রকম একটা পরিস্থিতি চলাকালে মধ্যরাতে ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়। এসব ঘটনার নেপথ্য রহস্য কী, সে ব্যাপারেও তাঁরা খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও গত মঙ্গলবার ১৪ দলের এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি হলে ছাত্রলীগের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে আছেন ছাত্রশিবিরের চিহ্নিত কর্মীরা। তাঁর এই বক্তব্যও গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।

গতকাল পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ এবং র‌্যাবের ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার রাজশাহীতে যান। রাজশাহীর ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব পালনে অবহেলা নিয়ে তাঁদের কাছেও অনেকে অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এ ব্যাপারে পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ এবং র‌্যাবের মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার কালের কণ্ঠকে জানান, পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাবকেও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। যা ঘটেছে তা খুবই দুঃখজনক। শিক্ষার জন্য এসে শিক্ষাঙ্গনকে রক্তাক্ত করবে, তা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। আর, কারো সম্পৃক্ততা বা ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তাঁরা জানান।


খবরের লিংক

No comments:

Post a Comment

মন্তব্য করুন